নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা প্রকাশিত: ০৭ জুন, ২০২৬
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার আলোচিত মামলায় প্রতিবেশী দম্পতি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।
আজ রোববার (৭ জুন) সকাল ১১টায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় পড়া শুরু করেন। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এবং বিচার শুরুর মাত্র ৬ কার্যদিবসের মধ্যে এই রায় ঘোষণা করা হলো, যা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে কোনো হত্যা মামলায় দ্রুততম রায়ের নজির।
আজ সকাল সাড়ে ৮টার পর থেকেই কাশিমপুর ও কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আসামিদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। বেলা ১১টার কিছু আগে তাদের এজলাসে তোলা হয়। রায় ঘোষণার সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছিল।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক মাসরুর সালেকীন উল্লেখ করেন, আসামিদের এই অপরাধ অত্যন্ত বর্বরোচিত, নৃশংস এবং কোনোভাবেই সংশোধনযোগ্য নয়। কোমলমতি শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এই ধরনের জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি না দিলে আদালত তার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হবে। রাষ্ট্রপক্ষ ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও অকাট্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে মিরপুরের পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তারের গলাকাটা ও খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সেদিন সকালে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার কৌশলে রামিসাকে তাদের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর স্বপ্নার সহায়তায় তার স্বামী সোহেল রানা শিশুটিকে বাথরুমে আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন চালায় এবং পরবর্তীতে গলা কেটে হত্যা করে। ঘটনার পর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে বালতিতে লুকিয়ে রাখা হয়। রামিসার জুতো দেখে পরিবারের সদস্যরা ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালালে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি প্রকাশ্যে আসে। এই ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাহ বাদী হয়ে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
রায়ের পর আদালত চত্বরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাহ। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা কাঙ্ক্ষিত বিচার পেয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দ্রুত বিচারের যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা পূরণ হয়েছে। আমরা এখন এই রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানাই।” রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলুও এই রায়ে পূর্ণ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।এদিকে সচিবালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “সব আইনি ধাপ মেনে মাত্র ৬ কার্যদিবসের মধ্যে এই বিচার সম্পন্ন করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দক্ষতার পরিচয় বহন করে।” একই সঙ্গে আগামী ৩ মাসের মধ্যে উচ্চ আদালতের সব প্রক্রিয়া শেষ করে এই রায় কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি